আজব শোনালেও বাস্তব। সবে বিশ্ববিদ্যালয়কে টাটা বাই বাই করে ঘুড়ে বেড়াচ্ছি। কাজ কর্মের খোজে এই দফতর ওই দফতরের দরজায় কড়া নাড়ছি। কিন্তুু নিরাশা ছাড়া আর কিছুই হাতে লাগছে না। সেই সময় এক শুভাকাঙ্খীর বুদ্ধিতে ছাত্র পড়ানো শুরু করলাম।
সেই শুভাকাঙ্খী হল আমার প্রথম ছাত্রী। বরাবরি আমি ইতিহাসের
সফল ছাত্র, তাই শুভাকাঙ্খীর উৎসাহে বাড়ীতেই খুলে দিলাম ইতিহাস পড়ানোর
টিউশন। টিউশন খুললেই তো হবেনা চাই ছাত্র সেই কাজ টাও শুরু করল সেই
শুভাকাঙ্খী। কয়েক মাসের মধ্যে জুটে গেল জনা কতক ছাত্র ছাত্রী। যদিও আমার
টিউশন গ্রুপের প্রথম ছাত্রী ছিল আমার সেই শুভাকাঙ্খী।
শুরু টা হল এই ভাবে, আমাদের পাড়াতেই বাস আমার শুভাকাঙ্খী
সুজাতার। সুজুর বাবা বয়সে বড় হলেও বন্ধু সুলভ মিশতেন আমাদের (আমি ও আমার
বন্ধুরা)সাথে। তাই তাদের বাড়ীতে যাতায়াত ছিল অবাদ।
একদিন সুজুদের বাড়ীতে আড্ডা চলা কালিন কথার প্রসঙ্গে উঠে
আশে কাজ কর্মের কথা যথারিতী নিরাশা ছাড়া আর কিছুই উত্তর দিতে পারলাম না
আমরা। ব্যাবসা নিয়ে আলোচনা হলেও তার জন্য চাই নগদ অর্থ সে কারনে ব্যাবসাটাও
আমাদের হলনা।
তখন সুজুই আমাকে বলল যে সূর্যদা তুমি কিন্তুু টিউশানি
করাতে পার ইতিহাসের জন্য অনেকেই মাষ্টার খুজছে, এমনকি আমিও। আমি ও আমার
বন্ধু বান্ধবিরা তোমার কাছে পড়বো। না না আলোচনার পর ফাইনাল হল টিউশন।
বেশ ভালোই চলছিল টিউশন। দেখতে দেখতে বেড়ে চলল ছাত্র
ছাত্রীর সংখ্যা। পড়ানোর কাজ টা আমার হলেও বাকী সব দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে
নিয়েছিল সুজু। কিন্তুু এই সব দায়িত্বের মাঝে ছিল এক নিরব ভালোবাসা যার
বহিপ্রকাশ হয় অনেক পড়ে।
ফাইনাল পরিক্ষার পর ব্যাচ থেকে বিদায় নিল সুজু কিন্তুু আমি
পড়লাম মহা বিপদে। কারন আমার তো ব্যাচ মেন্টেনের কোন কিছুই জানা নেই। যা
হোক ডাক পড়ল সুজুর। সাত দিন ধরে আমাকে সব বোঝালেও কোনটা মাথায় ঢুকলো কোনটা
মাথার উপর দিয়ে গেল।
আস্তে আস্তে নিজের আয়ত্বে আনার চেষ্ঠার মাঝে মাঝে যখনই
দরকার পড়ত তখনই সুজুর ডাক পড়ত। একদিন ডাক পড়তেই এসে আমাকে বলল আমি না থাকলে
কে দেখাবে তোমাকে?
আমি বললাম তুমি আছো তো দেখ যখন না থাকবে তখন দেখা যাবে।
কিন্তুু তুমি যাবে কোথায়? সে দিন আমি কোন উত্তর সুজুর কাছ থেকে পাই নি।
একটা কথা বলা প্রয়োজন টিউশনির চাপে প্রায় বন্ধ হয়ে গেল সুজুদের বাড়ীতে
আড্ডার আসর। সুজুর বাবা কয়েকবার ডেকে পাঠালেও যেতে পারিনি।
উত্তরটা পেয়েছিলাম কয়েক সপ্তাহ পর। না ডাকতেই সুজু এল।
নিয়ম মাফিক ঘরে এসে খাতা পত্র নিয়ে বসে পড়ল। একের পর এক খাতা চেক করছে তবে
লক্ষ্য করলাম খুবই চুপ চাপ বসে। ব্যাচ ছুটি দেবার পর সুজুর সাথে গল্প করতে
বসলাম।
টিউশনি টাইম গুলি পরিবর্তন করার চিন্তা ভাবনা রুম টা
ডেকরেশনের কথা আমি অনর্গল বলে গেলেও সুজু কিন্তুু হু আর হা ছাড়া আর কোন
উত্তর দিল না।
হঠাৎ আমার কথার মাঝে আমাকে জিঞ্জাসা করল ভাললবাসা মানে বোঝ? দুটো মনের মিল কি হয় জানো?
আমি সুজুর এই প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারিনি। আর এই
প্রশ্নের উত্তর খুজে পেয়েছিলাম অনেক পড়ে। সুজুই তখন আমায় বলল যে তার বাবা
তার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। বাধ্য হয়ে সে বিয়েতে রাজী হয়ছে। মন থেকে এই বিয়ে
সে মেনে নিতে পারে নি।
কারন সে মন দিয়ে একজনকে ভালোবাসে, বাবা তোমায় ডেকেছে। বলেই
ঘড় থেকে বেড়িয়ে চলে যায়। আমার হিসেব সব গন্ডগোল হয়ে যায়। কিছু একটা
হারানোর অনুভূতি আমাকে আকড়ে ধরতে শুরু করে। নানান চিন্তা আমাকে গ্রাস করতে
শুরু করল। সুজু যাকে ভালোবাসে কে সে? সুজুকে তার ভালোবাসার মানুষের হাতেই
তুলে দিতে হবে এই চিন্তাধারা নিয়ে সব ব্যাচ ছুটি দিয়ে চললাম তার বাড়ী। কে
সুজুর ভালোবাসার মানুষ?
দিন লগ্ন মাফিক সুজুর বিয়ে হয়ে গেল। আমারা খুব আনন্দ
করলাম। গোলটা বাধল বৌভাতের দিন। যথারিতি আমরা কন্যা পক্ষ। বরের বাড়ী
পৌছালাম সেখানেও খুব আনন্দ করলাম। এক সময় আমরা বন্ধুরা মিলে সুজুর পাশে বসে
গল্প শুরু করলাম।
এক সময় বন্ধুরা সরে যেতেই সুজু আমাকে বলল অনেক খুজলে
কিন্তুু আমার ভালোবাসার মানুষ কে খুজে পেলে। আমি মাথা নিচু করে তার উত্তর
দিলাম না। সুজু তারপর যখন আমাকে জানালো তার ভালোবাসার মানুষটি কে তখন আমার
যেন মনে পড়ল আমার সেইদিনের অনুভুতি হারানোর। আমি সেখান থেকে বেড়িয়ে চলে
আসলাম বাড়ী।
এরপর নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে। সুজুর বিয়ের পর প্রায়
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। প্রায় তিন বছর পার হয়ে গেল দেখতে দেখতে। একদিন
সুজুর বাবা আমার কাছে এসে বলল সুজু আমাকে ডেকেছে।
রাতের ব্যাচ শেষ করে আমি সুজুদের বাড়ীতে যাই। এতদিন কেন
সুজুর সাথে যোগাযোগ রাখিনি তার রাগ অভিমান দেখানোর পর আস্তে আস্তে
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। অনেকখন গল্প করার পর বাড়ীর জন্য রওনা হয়।সুজুদের
বাড়ীর বাইরে একান্তে আমাকে ডেকে সুজু আমাকে বলে আমি তোমার ভালোবাসা পাইনি
সেটা মেনে নিয়েছি। কিন্তুু সে তার একপক্ষের ভালোবাসাকে বাচিয়ে রাখতে চায়।
সেটুকু আমি তাকে দিতে পারবো কি না?
সুজুর কাছে আমি জানতে চাই সে কি ভাবে তা বাচিয়ে রাখতে চায়? কালকে জানাবে বলে সে চলে যায়।
কি ভাবে বাঁচিয়ে রাখতে চায় সে চিন্তায় সারারাত দুচোখের
পাতা এক করতে পারলাম না। পরের দিন সুজু এসে আমায় জানায় যে সে আমার সন্তানের
বাবা হতে চায়। এই চিহ্ন নিয়ে সে বেচে থাকতে চায়। আমি তাতে রাজি না হলেও
তার ইচ্ছা শক্তির কাছে হার মানি।
যতদিন সুজু বাড়ীতে ছিল সেই দিল গুলো আমারা মিলত হয়। এবং সে আমার সন্তানের মা এখন।
No comments:
Post a Comment